তবে উচ্চমূল্যে জ্বালানি তথা তেল-গ্যাস আমদানির কারণে সরকারি তহবিলের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে, এ কারণে দেশের সব নাগরিককে জ্বালানিসাশ্রয়ী নীতির আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। বাড়তি মূল্যে আমদানির কারণে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ক্ষয় বাড়ছে, এজন্য রেশনিং, সাশ্রয়ের পাশাপাশি জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করছে বলে জানান তিনি।
চট্টগ্রামের কোরিয়ান ইপিজেডে গতকাল এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে এখন বিকল্প উৎস থেকে তেল-গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে। এতে ব্যয় অনেক বেড়ে গেলেও কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের কৃষি, উৎপাদন ও আমদানি-রফতানি কার্যক্রম ধরে রাখতে বাড়তি দাম হলেও আনতে হচ্ছে।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে শিল্প-কারখানা, কৃষি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবন থমকে যাবে। তাই বেশি দামে হলেও জ্বালানি কিনতে হচ্ছে।’ তিনি দাবি করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পেরেছে। পরিবহন ব্যবস্থা সচল রয়েছে, শিল্প উৎপাদন চলছে এবং কৃষি খাতেও বড় ধরনের কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘ঈদের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত নির্বিঘ্ন ছিল, যা জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতারই প্রমাণ।’ তবে এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকার এরই মধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য জ্বালানি ব্যবহারে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি রেশনিং করা হয়েছে। নির্ধারিত সীমার বাইরে গেলে ব্যক্তিগতভাবে খরচ বহনের নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা সবাই সাশ্রয়ী কর্মসূচির আওতায় আছি। এ পরিস্থিতিতে অপচয়ের কোনো সুযোগ নেই।’ তিনি সাধারণ জনগণকেও জ্বালানি ব্যবহারে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়তে পারে। সরকারি বাজেট, উন্নয়ন কার্যক্রম ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে।’
জ্বালানির মূল্য বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব পড়বে কিনা—এ প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সার, পরিবহন ও খাদ্যপণ্যের দামও বাড়তে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।’ তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির তুলনায় বাংলাদেশ এখনো তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
এদিকে দেশের রফতানি আয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা ধীরগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও কৃষিপণ্যের রফতানি কমেছে। তবে এটিকে সাময়িক পরিস্থিতি হিসেবে দেখছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপের কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমাদের গার্মেন্টস খাতের উদ্যোক্তারা সক্ষম। অতীতেও তাদের সক্ষমতার প্রমাণ করেছেন। তারা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।’
দেশে সাম্প্রতিক রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। এ সময় পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শিগগিরই বড় ধরনের সংস্কার আনা হবে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকনির্ভর বিনিয়োগ ব্যবস্থার কারণে ব্যাংক খাতে চাপ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে বড় বিনিয়োগগুলো পুঁজিবাজারের মাধ্যমে আনার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এতে একদিকে বিনিয়োগকারীরা নতুন সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে ব্যাংক খাতের ওপর চাপ কমবে।’
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরো বলেন, ‘আমরা একটি কার্যকর ও আস্থাশীল পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে চাই, যেখানে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীরা সমানভাবে উপকৃত হবেন।’ এজন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত পরিবর্তনের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশের নয়, বৈশ্বিক একটি চ্যালেঞ্জ। তাই এ সংকট মোকাবেলায় সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সরকার তার জায়গা থেকে কাজ করছে, তবে জনগণের সহযোগিতা ছাড়া এ সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।’